বিশেষ আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য প্রতিবেদন | ধম্মইনফো
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান দিয়েগোতে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘বৌদ্ধ মন্দির অব সান দিয়েগো’ (Buddhist Temple of San Diego) সফলভাবে তার প্রতিষ্ঠার এক শতাব্দী বা শতবর্ষ পূর্ণ করেছে। ১৯২৬ সালে জাপানি অভিবাসী ও জোডো শিনশু (Jodo Shinshu) বৌদ্ধধর্মের অনুসারীদের হাতে গড়ে ওঠা এই ঐতিহ্যবাহী বিহারটি গত একশ বছরে নানা ঐতিহাসিক সংকট, যুদ্ধকালীন দমনপীড়ন এবং সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজ আমেরিকার মূলধারায় বৌদ্ধ দর্শনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ সংবাদ মাধ্যম বুদ্ধিস্টডোর গ্লোবাল (Buddhistdoor Global)-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই ঐতিহাসিক শতবর্ষ পূর্তি উদযাপনের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
গত শতাব্দীর বিশের দশকে ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো ও এর আশেপাশের অঞ্চলে প্রচুর জাপানি অভিবাসী কৃষিজীবী ও ব্যবসায়ী বসতি স্থাপন করেছিলেন। নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং শিকড়ের সাথে যুক্ত থাকার পাশাপাশি প্রবাসের প্রতিকূল পরিবেশে আত্মিক শক্তি অর্জনের জন্য তাঁরা একত্রিত হন এবং ১৯২৬ সালে তাঁদের সম্মিলিত উদ্যোগে সান দিয়েগো বৌদ্ধ মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে এটি কেবল জোডো শিনশু বা ‘পিওর ল্যান্ড’ (Pure Land) বৌদ্ধধর্মের উপাসনার স্থানই ছিল না, বরং সান দিয়েগোতে নতুন জীবন শুরু করা জাপানি জনগোষ্ঠীর সামাজিক মেলামেশা, পারস্পরিক সহায়তা এবং সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছিল।

সান দিয়েগো মন্দিরের এক শতাব্দীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে মার্কিন সরকারের যুদ্ধকালীন নীতি ও এশীয়-বিরোধী সামাজিক উত্তেজনার জেরে ক্যালিফোর্নিয়ার হাজার হাজার জাপানি-আমেরিকানকে জোরপূর্বক বিভিন্ন অন্তরীণ শিবিরে (Internment Camps) বন্দি করা হয়। এই চরম সংকটের মুখে মন্দিরের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকে এবং বহু মূল্যবান ঐতিহাসিক ধর্মীয় সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে যুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালের পর বন্দিশিবির থেকে মুক্তি পেয়ে ফিরে আসা জাপানি অভিবাসীরা দ্বিগুণ উদ্যমে মন্দিরটি পুনর্গঠন করেন, যা তাঁদের ধর্মীয় আস্থার এক অনন্য নজির স্থাপন করে।
শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত সানঘা সদস্য, জাপানি বংশোদ্ভূত মার্কিন পরিবার, স্থানীয় বৌদ্ধ অনুরাগী এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের অংশগ্রহণে মন্দির প্রাঙ্গণ এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। তিন দিনব্যাপী এই উদযাপনে জোডো শিনশু ঐতিহ্যের মূল ধারা মেনে পূর্বসূরিদের স্মরণে বিশেষ ‘নেম্বুটসু’ ও শান্তি প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। একই সাথে ঐতিহ্যবাহী তাইকো (Taiko) ড্রামের সুর, জাপানি নৃত্য, লোকউৎসব ‘বোন ওদোরি’ (Bon Odori) পরিবেশন এবং বিগত ১০০ বছরের দুর্লভ আলোকচিত্র সম্বলিত একটি বিশেষ আর্কাইভ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিষ্ঠার সময় এটি মূলত একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর মানুষের উপাসনালয় হলেও সময়ের সাথে সাথে সান দিয়েগো বৌদ্ধ মন্দির তার গণ্ডি পেরিয়ে এক সর্বজনীন রূপ ধারণ করেছে। বর্তমানে এখানে বিভিন্ন জাতি, বর্ণ ও সংস্কৃতির মানুষ বৌদ্ধ দর্শন, ধ্যান (Meditation) এবং মৈত্রী চর্চা করতে আসেন। শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ধর্মগুরু ও অতিথিরা ব্যক্ত করেন যে, পূর্বসূরিদের আত্মত্যাগ ও বুদ্ধের করুণার বাণীকে পাথেয় করে এই মন্দির আগামী শতকেও সান দিয়েগোসহ সমগ্র আমেরিকায় শান্তির আলো ছড়িয়ে যাবে।

স্বপ্ন এবং দায়িত্ববোধ থেকে ধম্মইনফো-ডট-কম এর সূচনা। ২০১১ সালে বাংলায় প্রথম অনলাইন বৌদ্ধ সংবাদ পোর্টাল হিসেবে ধম্মইনফো যাত্রা শুরু করে, যা বৌদ্ধধর্ম, ইতিহাস, সংস্কৃতি, এবং নীতিমালা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রচারে পাঠকের ব্যাপক গ্রহণ যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা লাভ করে। ২০১২ সালে রামুতে মৌলবাদী হামলার পর এটি একটি শক্তিশালী সংবাদ মাধ্যম হিসেবে বাংলাদেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তর বাংলা ভাষী বৌদ্ধদের কাছে পরিচিতি লাভ করে। যদিও নিরাপত্তাজনিত কারণে ২০১৮ সালে সাইটটি প্রকাশনা বন্ধ করা হয়, ২০২৪ সালে ধম্মবিরীয় ভিক্ষুর নেতৃত্বে এটি আবার চালু হলে ধম্মইনফো বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার, বাংলাদেশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে সংবাদ, ঐতিহাসিক নিদর্শন, মণিষীদের জীবনী প্রকাশ, এবং ধর্মীয় উন্নয়নে কাজ করছে।
