১৯৫৬ সালের ১৪ অক্টোবর—যা ভারতীয় সামাজিক ও ধর্মীয় ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। আধুনিক ভারতের সংবিধানপ্রণেতা, সমাজ সংস্কারক ও মুক্তিকামী নেতা ড. ভীমরাও রামজি (বি আর) আম্বেদকর নাগপুরের ঐতিহাসিক ‘দীক্ষভূমি’তে তাঁর লক্ষাধিক অনুসারীকে সাথে নিয়ে প্রথাগত হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে আনুষ্ঠানিকভাবে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ঠিক ৫৩ দিন পর, ১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি পরলোকগমন করেন। ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে (India Today)-তে প্রকাশিত এক বিশেষ স্মারক প্রতিবেদনে ভারতরত্ন ড. আম্বেদকরের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত এবং বৌদ্ধধর্মকে বেছে নেওয়ার গভীর সামাজিক ও আধ্যাত্মিক দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আম্বেদকরের এই রূপান্তর কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল কয়েক দশকের গভীর অধ্যয়ন, পর্যবেক্ষণ ও সামাজিক আন্দোলনের এক যৌক্তিক পরিণতি। ১৯৩৫ সালে ইয়েওলা (Yeola) সম্মেলনে তিনি তাঁর বিখ্যাত ঘোষণাটি দিয়েছিলেন—“আমি হিন্দু হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছি, কিন্তু হিন্দু হিসেবে মৃত্যুবরণ করব না।” অনগ্রসর ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর প্রতি জাতিভেদ প্রথা, অস্পৃশ্যতা এবং সামাজিক বৈষম্যের শিকল ভেঙে একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের দীর্ঘ লড়াইয়ে তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, তৎকালীন কাঠামোর ভেতরে থেকে পূর্ণ মানবিক মর্যাদা অর্জন করা সম্ভব নয়।
সুদীর্ঘ ২১ বছর ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় দর্শন গভীরভাবে অধ্যায়নের পর ড. আম্বেদকর বৌদ্ধধর্মকেই তাঁর প্রধান পথ হিসেবে নির্বাচন করেন। এর পেছনে মূল কারণ ছিল বুদ্ধের প্রচারিত ‘প্রজ্ঞা’ (জ্ঞান), ‘করুণা’ (সহমর্মিতা) এবং ‘সমতা’ (সাম্য)-র ভিত্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন, বুদ্ধের ধর্ম কোনো অন্ধবিশ্বাস বা কোনো ঈশ্বরের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এটি যুক্তি, মানবতা ও প্রগতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি বৌদ্ধধর্মের সামাজিক পুনর্জাগরণ ঘটাতে ‘নবায়ন’ বা ‘নবযান’ (Navayana) দর্শনের সূচনা করেন, যা প্রাচীন প্রথা ও কুসংস্কারকে দূরে ঠেলে সমতা ও মানবতার জয়গান গায়।
১৯৫৬ সালের সেই শুভ আস্বিন পূর্ণিমার দিনে নাগপুরে অনুষ্ঠিত মহা দীক্ষা অনুষ্ঠানে প্রায় ৫ লাখ অনুসারী তাঁর সাথে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হন। তিনি তাঁর অনুসারীদের জন্য ২২টি বিশেষ প্রতিজ্ঞা (22 Vows) প্রবর্তন করেন, যা তাঁদের অজ্ঞতা, বৈষম্য ও দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে আত্মমর্যাদাপূর্ণ নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার বার্তা দেয়। মৃত্যুর মাত্র ৫৩ দিন আগে তাঁর এই গ্রহণ করা সিদ্ধান্ত কেবল ভারতের কোটি কোটি নিগৃহীত মানুষকে আত্মপরিচয় ও সামাজিক মুক্তি দেয়নি, বরং আধুনিক ভারতে বৌদ্ধধর্মের এক নজিরবিহীন পুনর্জাগরণ ঘটায়।

প্রকাশক ও সম্পাদক, ধম্মইনফো-ডট-কম
