যুদ্ধ, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সামাজিক বিভাজনের এই সময়ে বিশ্ব ক্রমেই সহনশীলতা হারাচ্ছে। ক্ষমতার ভাষা যত উচ্চরিত হচ্ছে, মানবিকতার কণ্ঠ ততই ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকার টেক্সাস থেকে ওয়াশিংটন ডি.সি.-এর উদ্দেশে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের প্রায় ২,৩০০ মাইল দীর্ঘ ‘Walk for Peace’ বা শান্তির জন্য পদযাত্রা একটি ব্যতিক্রমী ও সময়োপযোগী বার্তা বহন করছে। এটি কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, তবু এর নৈতিক অভিঘাত রাজনীতি ও সমাজ—উভয় ক্ষেত্রেই গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নর্থ ক্যারোলিনার হাইওয়ে-৬৪-এর ধারে হাজার হাজার মানুষ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে এই পদযাত্রাকে স্বাগত জানিয়েছেন। এমন দৃশ্য আধুনিক আমেরিকায় বিরল। এটি স্পষ্ট করে দেয়—সমাজ যতই বিভক্ত হোক না কেন, মানুষের অন্তরে শান্তির আকাঙ্ক্ষা এখনও জীবিত।

বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এই যাত্রায় কোনো স্লোগান দিচ্ছেন না, কোনো দাবি উত্থাপন করছেন না। তবু তাদের গেরুয়া বসনে নীরব পদচারণা মানুষের বিবেকে নাড়া দিচ্ছে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের হাত জোড় করা প্রণাম, অশ্রুসজল চোখ কিংবা সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে—এই পদযাত্রা যুক্তির নয়, অনুভূতির স্তরে কাজ করছে। আমেরিকার মতো একটি বস্তুবাদী সমাজে এই পর্যায়ের ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন বিরল এবং তা গভীর আত্মসমালোচনার জন্ম দেয়।
এই পদযাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ। কেউ ফুল দিচ্ছেন, কেউ ফল বা পানির বোতল এগিয়ে দিচ্ছেন। এসব ছোট উপহার নিছক সৌজন্য নয়; এগুলো আধুনিক সমাজে হারিয়ে যেতে বসা মানবিক সংযোগের পুনরুদ্ধার। একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সমাজের ভাঙন অনিবার্য নয়, যদি মানুষ মানুষ হিসেবে একে অপরকে দেখতে শেখে।
‘Walk for Peace’ কোনো ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়। খ্রিস্টান, ইহুদি, মুসলিম, আদিবাসীসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এতে সংহতি প্রকাশ করছেন। এই বহুধর্মীয় অংশগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—শান্তি কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা মতাদর্শের সম্পত্তি নয়; এটি একটি সার্বজনীন মানবিক মূল্যবোধ। বর্তমান বিশ্বে, বিশেষ করে আমেরিকার মতো বহুসাংস্কৃতিক সমাজে, এই উপলব্ধি অত্যন্ত জরুরি।

ডিজিটাল যুগে এই পদযাত্রার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক উপস্থিতিও তাৎপর্যপূর্ণ। নেতিবাচক ও বিভাজনমূলক সংবাদের ভিড়ে এই যাত্রা এক ইতিবাচক প্রতিস্বর হিসেবে কাজ করছে। এটি প্রমাণ করে—প্রযুক্তি চাইলে ঘৃণা ছড়াতে পারে, আবার চাইলে শান্তি ও সংহতির বার্তাও পৌঁছে দিতে পারে।
অবশ্য এই যাত্রার পথ মোটেও সহজ নয়। টেক্সাস থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ পথচলায় শারীরিক ক্লান্তি, প্রতিকূল আবহাওয়া ও নানা ঝুঁকি রয়েছে। তবু ভিক্ষুদের অবিচল সংকল্প সাধারণ মানুষের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে—শান্তি কি কেবল আকাঙ্ক্ষার বিষয়, নাকি তা অর্জনের জন্য ত্যাগ ও ধৈর্য প্রয়োজন?
আজ ‘Walk for Peace’ কেবল একটি পদযাত্রা নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক আরোগ্যের প্রক্রিয়া। হাইওয়ের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা অশ্রুসজল চোখগুলো আসলে বিশ্বব্যাপী শান্তির জন্য মানুষের গভীর আকুলতার প্রতিফলন। এই পদযাত্রা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অস্ত্র নয়, প্রয়োজন নৈতিক সাহস, করুণা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা।
সম্পাদকীয় দৃষ্টিতে বলা যায়, এই পদযাত্রা আমাদের সবার জন্য একটি আত্মসমালোচনার আহ্বান। আমরা কি কেবল সংঘাতের সংবাদে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, নাকি শান্তির এই নীরব ডাক শোনার মানসিকতা এখনও আমাদের আছে? সমাজ ও রাষ্ট্র যদি সত্যিই স্থিতিশীল ও মানবিক হতে চায়, তবে এই নীরব পদযাত্রার শিক্ষা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

প্রকাশক ও সম্পাদক, ধম্মইনফো-ডট-কম
