বৌদ্ধদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান কঠিন চীবর দানোৎসব এই বছর বাংলাদেশে ১৭ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে ১৪ নভেম্বর মাসব্যাপী ধারাবাহিক ধর্মীয় দান কর্ম সমাপ্ত হয়েছে। বিভিন্ন ভয় ও শংকা নিয়ে কঠিন চীবর দানের মাস শুরু হলেও দুই একটি অনাকাঙ্খিত ঘটনা ছাড়া মাসব্যাপী বৌদ্ধদের কঠিন চীবর দান উদযাপন শেষ হয়েছে। এই বছর ‘বাবু, নেতা ও দানবীর’ এর প্রভাব কম দেখা গেছে। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হয়েছে দেশের এই বছর পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান) বৌদ্ধরা কঠিন চীবর দানোৎসব উদযাপন করতে না পারা।
তিন পার্বত্যজেলার বৌদ্ধরা কঠিন চীবর দান করতে না পারায় পাহাড়ের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অধিকার বঞ্চনা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও তাদের জীবন মানের গভীর হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতা শংকা স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়েছে।
এই বছরের কঠিন চীবর দানের বিশ্লেষণ নিয়ে এই প্রতিবেদন।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা
এ বছর, পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তীব্র ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে পাবত্য চট্টগ্রামের ৮ লক্ষ্যের অধিক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষজন তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান পালন করতে পারেননি। খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে সাম্প্রদায়িক হামলা, বিহারে আক্রমণ, ভাঙচুর, লুটপাট, এবং শতাধিক দোকানের অগ্নিসংযোগ ঘটেছে। এসব সহিংসতায় চারজন নিহত হয় এবং বহু মানুষ আহত হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা সাধারণত পার্বত্য অঞ্চলে একাধিকবার ঘটলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
এ বছরের এই ভয়াবহ সহিংসতা ও ধর্মীয় আক্রমণ, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে এক গভীর হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতার আশংকা সৃষ্টি করেছে। যার ফলশ্রুতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘ ও সাধারণ বৌদ্ধরা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, কারণ প্রশাসন এ ধরনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার করতে ব্যর্থ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিন দিন অবনতি, এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহিংসতা থামানোর জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
এমন চলমান ভয়াবহ ঘটনার প্রেক্ষাপটে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ সম্প্রদায় এবং ভিক্ষু সংঘ তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে এক গভীর উদ্বেগ এর কারণে (৬ অক্টোবর) রাঙামাটি বনরূপা মৈত্রী বিহারে এক সংবাদ সম্মেলন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্মিলিত ভিক্ষু সংঘ এই বছর মাসব্যাপী কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান না করার ঘোষণা দেয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বক্তব্য, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা আজ এক কঠিন চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। দেশে একদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতা সুরক্ষিত না থাকায়, অন্যদিকে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা এবং সরকারের পক্ষ থেকে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ অত্যন্ত তীব্র হয়ে উঠার কারণে এ বছর তিনটি পার্বত্য জেলায় কঠিন চীবর দানোৎসব পালন করা হয়নি, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলংকজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি এমন আচরণ, তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাহীনতা প্রকাশ হয়েছে।
সেনা বাহিনীর উপস্থিতি: বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিপন্ন
বৌদ্ধদের ধর্মের অনুষ্ঠানগুলো অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ এবং ভাবগম্ভীর পরিবেশে পালন করা হয়। ভিক্ষুসংঘ এবং ধর্মীয় অনুসারীরা এই সব অনুষ্ঠানগুলোকে শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করেন, যেখানে ধর্মীয় আচার ও শান্তির বার্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ছত্তরপিটুয়া আর্যশ্রাবক সংঘ এবং অরণ্যারাম ভাবনা কেন্দ্র-এ ১৮ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে সেনা বাহিনীর উপস্থিতি ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। সেখানে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও সাধারণ বৌদ্ধরা অভিযোগ করেছেন যে, সেনা সদস্যদের উপস্থিতি তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এক ধরনের বাধা সৃষ্টি করেছে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আগত নারী-শিশুদের মনে ভয় এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যকে ক্ষুণ্ন করেছে।
এ নিয়ে সাধারণ বৌদ্ধরা সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, যে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো শান্তিপূর্ণ এবং কোনো ধরনের বাহ্যিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই পালন করা উচিত, সেখানে সেনা বা পুলিশ বাহিনীর উপস্থিতি এক ধরনের ভীতি ও অবমাননা সৃষ্টি করেছে। শান্তিপ্রিয় সাধারণ বৌদ্ধরা মনে করছেন, এমন পরিস্থিতি তাদের নিরাপত্তাহীনতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি আস্থা ভঙ্গের মতো।
বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সম আসনে পুলিশের আসন: সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক ও প্রতিবাদ
অন্যদিকে বাঁশখালী কেন্দ্রীয় শীলকূপ চৈত্য বিহারে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও পুলিশের কর্মকর্তাদের সম আসনে উপস্থিতি এবং আসন না পেয়ে পুলিশের পেছনে এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর দাড়িয়ে থাকাকে ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধরা স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করেনি। এই ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ দেখা গেছে সামাজিক মাধ্যমে।
সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
তিন পার্বত্য জেলায় কঠিন চীবর দান করতে না পারা, ছত্তরপিটুয়া আর্যশ্রাবক সংঘ এবং অরণ্যারাম ভাবনা কেন্দ্রে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি এবং শীলকূপ চৈত্য বিহারে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও পুলিশের কর্মকর্তাদের সম আসন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে অনেকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, “ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।” অনেকেই আবার এটাও বলেছেন যে, সারা দেশে যদি একই ধরনের আচরণ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে করা হয়, তবে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য এটি একটি বড় ধরনের সংকট হয়ে দাঁড়াবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের পরিস্থিতি থেকে মুক্তি না পেলে বাংলাদেশে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং বহুত্ববাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। একদিকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, অন্যদিকে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া, এটি বাংলাদেশের ধর্মীয় চিত্রের জন্য একটি অন্ধকার অধ্যায় হতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতি সামাজিক সহিষ্ণুতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তারা বলেন, “ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের মতো করে আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে দেওয়া উচিত, আর কোনো বাহিনী বা বাহ্যিক শক্তি যদি সেখানে হস্তক্ষেপ করে, তা ধর্মীয় সংহতির পক্ষে ক্ষতিকর হবে।”
এছাড়া, অনেক বৌদ্ধদের মতে, এসব ঘটনাগুলি ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার লঙ্ঘন করছে, কারণ ধর্মীয় স্বাধীনতা সুরক্ষা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
কঠিন চীবর দানে বাবু , নেতা ও দানপতিদের প্রভাব হ্রস
প্রতিবছর কঠিন চীবর দানের মাস শুরু হলে দেশের বাবু, দানপতি ও নেতাদের প্রভাব, হাক ডাক, আধিপত্য ব্যাপক হরে বেড়ে যায়। বিগত বছরগুলোতে কঠিন চীবর দানের সময় বাবু, নেতা ও দানপতিদের আর্থিক ও সামাজিক প্রভাব অনেক বেশি ছিল। তাদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানে একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করত, যেখানে দানের আকার, প্রদর্শনীমূলক আচরণ এবং উচ্চকণ্ঠ প্রচারণা ধর্মীয় ঐতিহ্যের চেয়ে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি গঠনে বেশি প্রাধান্য পেত। এতে সময় ধর্মপ্রাণ সাধারণ বৌদ্ধরা এই প্রভাবের কারণে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রদর্শনীর প্রভাব মুখ্য হয়ে উঠত।
চলতি বছরের কঠিন চীবর দানে বাবু, নেতা ও দানপতিদের প্রভাব হ্রাস একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সাধারণ বৌদ্ধরা এতে আনন্দিত, কারণ এই পরিবর্তনের ফলে অনুষ্ঠানটি আরও বেশি ধর্মীয় পরিবেশ এবং শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়েছে।
উপসংহার: ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ
২০২৪ সালের কঠিন চীবর দান মাসব্যাপী উদযাপন সাধারণ বৌদ্ধদের জন্য শান্তিপূর্ণ হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কারণে ধর্মীয় স্বাধীনতা চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে বিহার ধ্বংস, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, এবং হতাহতের ঘটনা সাধারণ বৌদ্ধদের নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা বাড়িয়েছে।
সামরিক বাহিনীর ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিতি ও হস্তক্ষেপ ভীতি এবং ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। বাঁশখালীতে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও পুলিশের সমাসন নিয়েও বিতর্ক ছড়িয়েছে। এতে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, বাবু ও দানপতিদের প্রভাব হ্রাস সাধারণ বৌদ্ধদের মধ্যে সন্তোষের জন্ম দিয়েছে, কারণ এটি অনুষ্ঠানকে আরও শান্তিপূর্ণ ও ধর্মীয় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
তিন পার্বত্য জেলায় কঠিন চীবর দান করতে না পারা, ছত্তরপিটুয়া আর্যশ্রাবক সংঘ এবং অরণ্যারাম ভাবনা কেন্দ্রে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি এবং শীলকূপ চৈত্য বিহারে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও পুলিশের কর্মকর্তাদের সম আসন ঘটনায় বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে বাহিনীর হস্তক্ষেপ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং প্রশাসনিক উদাসীনতা একযোগে বাংলাদেশের ধর্মীয় গৌরবকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই পরিস্থিতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে বাংলাদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতার জন্য একটি গুরুতর সংকটের সৃষ্টি হতে পারে, যা দেশের শান্তি এবং সাম্প্রদায়িক ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
এখন প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু তদন্ত প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক শক্তি এবং রাজনৈতিক নেতাদের দৃঢ় পদক্ষেপ, যাতে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা সুরক্ষিত থাকে, এবং দেশের বৈচিত্র্যময় সমাজে শান্তি ও সহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রকাশক ও সম্পাদক, ধম্মইনফো-ডট-কম