২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৬ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০১৭ইংরেজী

ছোটদের গৌতম বুদ্ধ

শনিবার, ২১ মে ২০১৬ ০৩:৪০ সেতু

আজকে যারা ছোট, ভবিষ্যতে তারাই একদিন বড় হবে, জাতিকে নেতৃত্ব দিবে। তাই আজকের কিশোর কিশোরীদের “গৌতম বুদ্ধ” এর জীবনী অনেক ভালমতে জানা দরকার। বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধের জন্ম থেকে পরিনির্বাণকাল পর্যন্ত সময়ের নানা দিক এবং বুদ্ধযুগ ও বুদ্ধোত্তর যুগে সারা ভারতবর্ষব্যাপী বিভিন্ন বিখ্যাত মনীষী এবং বিশিষ্ট রাজন্যবর্গ যারা বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণপূর্বক বৌদ্ধধর্মকে ভারতের অভ্যন্তরে এবং বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছেন, সারা ভারতবর্ষ জুড়ে তাঁদের কর্তৃক গড়া শত শত অমর কীর্তিগুলো এখনো বৌদ্ধযুগের গৌরবজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
তোমরা যারা আজ কিশোর/কিশোরী এবং আগামী দিনের সমাজ পিতা, তোমরাই আগামীতে বড় হয়ে বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করার পাশাপাশি নিজের ধর্ম, কৃষ্টি-সংস্কৃতি, শিল্প ইতিহাস, ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার এবং সংরক্ষণে অধিকতর সক্রিয় হবে বলে প্রথমেই গৌতম বুদ্ধের জীবনী ভালোভাবে জানতে হবে। পাশাপাশি এতদসংক্রান্ত দেশ বিদেশের বিভিন্ন লেখকদের অনেক বই পড়তে হবে। নিজে জ্ঞান অর্জন করবে এবং তা অন্যকে জানাতে চেষ্টা করবে। তাহলেই দেখা যাবে তোমাদের মধ্যেই হয়ত একদিন শত শত আম্বেদকর কিংবা ডঃ বেণীমাধব বড়ুয়ার সৃষ্টি হয়ে যায়। এ যুগে বৌদ্ধধর্মের পুণর্জাগরণে প্রচার ও প্রসারে অনেক বেশী অগ্রণী ভুমিকা পালন করবে।
যে কোন মহা পুরুষের পুর্ণ জীবন বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করা খুবই কঠিন ব্যাপার, আর তা যদি হয় মহামানব গৌতম বুদ্ধের তাহলে তো এই কাজটি দুঃসাধ্যই বটে। প্রায় ২৫৬০ বৎসর পরে এসেও গৌতম বুদ্ধের জীবন-যাপন, মুখঃনিসৃত বাণী এবং শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে বৌদ্ধ পন্ডিতরা গবেষণা করেই যাচ্ছেন। তথাপি অনেক ব্যাপারে গবেষণা করার অনেক বাকি থেকে গেছে। প্রতিনিয়ত আধুনিকায়ন হচ্ছে। এতবড় একজন মহামানবের জীবনী এই অল্প পরিসরে পুরোপুরি তোলা অসম্ভব। তাই ধারাবাহিক ভাবে গৌতম বুদ্ধের জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করছি এই সংকলনে।

অংশ-১
সিদ্ধার্থের জন্ম
বুদ্ধযুগ (গৌতম বুদ্ধের জন্ম)

অনেক অনেক আগের কথা। তখন হিমালয়ের পাদদেশে কতিপয় ছোট ছোট রাজ্য ছিল। প্রতিটি রাজ্য স্ব-স্ব রাজা কর্তৃক পরিচালিত হত। তাছাড়া সেকালে ভারতে প্রায় ১৬টি বৃহৎ রাজ্যের নাম পাওয়া যায়। বৌদ্ধ সাহিত্যে ওই রাজ্যগুলোকে মহাজনপদ বলা হতো। মহা জনপদগুলি হলো যথাক্রমে মগধ, কৌশল, মল্ল, চেদি, বৎস বা বংশ, পাঞ্চল, অশ্মক, অবন্তী, কম্বোজ, গান্ধার, অঙ্গ, বৃজি, কুরূ, মৎস, শূরসেন, কাশি প্রভৃতি। মহাজনপদগুলির পাশাপাশি উত্তর-পুর্ব ভারতে কতকগুলি স্বয়ং শাসিত জাতি বা গোষ্টির নাম পাওয়া যায়। যেমনঃ কপিলাবস্তুর শাক্য, বৈষালীর লিচ্ছবী, অল্পকল্পের বুলি, কেশপুত্তের কলোম, রামগামের কোলিয়, পাবার মল্ল, পিপ্পলিবনের মোরিয় ও মিথিলা বিদেহ ইত্যাদি। এদের মধ্যে শাক্য ছিল একটি সম্মৃদ্ধশালী রাজ্য। শাক্য কুলরাজগণ বংশ পরম্পরায় এই রাজ্য শাষণ করতেন। তারা ছিলেন ক্ষত্রিয়। রাজা কর্তৃক শাসিত হলেও রাজ্যে গণতন্ত্র বিরাজমান ছিল। শাক্য রাজ্য উত্তর ভারতে বস্তি ও গোরক্ষপুর জেলার উত্তরে বর্তমানে নেপালের দক্ষিণ সীমান্ত হতে ৪ মাইল দূরে। এই রাজ্য বৈশালীর অন্তর্গত ছিল। বছরের অধিকাংশ সময় শ্বেত শুভ্র তুষারাবৃত এই রাজ্যটি ছোট ছোট পাহাড় দিয়ে ঘেরা। পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে গেছে রোহিনী নামের ছোট একটি নদী। এর দক্ষিণে ছিল কোশল আর পুর্বে ছিল মগধ রাজ্য।
খ্রীস্ট পুর্ব ৭ম শতাব্দীতে শুদ্ধোধন নামক এক যুবরাজ এই রাজ্যের রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হলেন। শুদ্ধোধন ছিলেন শাক্য রাজ্যের অধীশ্বর সিংহহনুর পুত্র। মাতা ছিলেন দেবদহ শাক্য কন্যা কাত্যায়নী। চারভাই, দুই বোনের মধ্যে শুদ্ধোধন ছিলেন সবার বড়। বর্তমানে নেপালের সীমান্তবর্তী কপিলাবস্তু নগরী ছিল এই রাজ্যের রাজধানী। রাজা ছিলেন শান্ত ও উদার প্রকৃতির। ফলে রাজ্যেও সর্বদা শান্তি-শৃংখলা বিরাজ করত। অন্যের দ্বারা আক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত শাক্যরা সহজে অন্যদের বিরক্ত করত না বলে তারা শান্তিপ্রিয় গোত্র হিসেবে পরিচিত। পশুপালন ও কৃষিকার্য ছিল তখনকার শাক্যদের অন্যতম জীবিকা।
পার্শ্ববর্তী কলিরাজ্যের রাজা রাজা অঞ্জনশাক্যের(মতান্তরে অনু শাক্য) মহামায়া ও মহাপ্রজাপতি নামে দুই কন্যা ছিলো। প্রথমা কন্যা মহামায়ার সাথে রাজা শুদ্ধোধন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। কলিরাজ্য ছিল শাক্যদের সামন্ত রাজ্য। কলি রাজ্যের রাজধানী ছিল দেবদাহ। সেই রাজ্যের রাজাও ছিলেন ন্যায়পরায়ণ ও প্রজাবৎসল।
রাজা ও রানী ছিলেন খুবই ধর্মপরায়ন ও ন্যায়পরায়ন। একে একে দীর্ঘ কয়েকটি বৎসর কেটে গেলো। রাজ্যের প্রজাদের মধ্যে সুখশান্তির কমতি নেই। শান্তি ছিলনা শুধু রাজপরিবারে। কারণ রাজপরিবারে তখনো কোনো নবজাতকের আগমন ঘটেনি। যিনি হবেন শাক্য রাজ্যের ভাবী উত্তরাধিকারী। সন্তান কামনায় অনেক পূজা অর্চনা, ব্রত পালন, মানত ও যাগ-যজ্ঞাদি করা হতো।
সেকালে, শাক্য রাজ্যের প্রথা অনুযায়ী ফি-বছর কপিলাবস্তুতে মহা ধুমধামের সাথে দিবারাত্র সাতদিনব্যাপী বসন্ত উৎসবের আয়োজন করা হতো। প্রতিবারের মতো এবারো রাণী বসন্ত উৎসবে যোগ দেন এবং সহস্র সহস্র মুদ্রা ব্যয়ে দান কার্য সম্পন্ন করেন। উৎসব শেষে উত্তম আহার্য্য গ্রহণ করে উপসথব্রত পালন করেন। কয়েকদিনের একটানা রাতজাগার ফলে ক্লান্ত, অবশান্ত দেহে রাণী রাজপ্রাসাদের নিজ শয়ন কক্ষে এসে সোনার পালংকে আলতোভাবে দেহকে হেলিয়ে দিলে, নিদ্রাদেবী হাতছানী দিয়ে ডাকে। শেষ রাত্রে তিনি এক বিস্ময়কর স্বপ্ন দেখেন। রাণী স্বপ্নে দেখতে পেলে নযে, চারজন স্বর্গের দুত পালংকের চারপাশে এসে দাঁড়ালেন, পরক্ষণেই তারা পালঙ্ক সহ রাণীকে নিয়ে হিমালয়ের চুড়ায় এক বিশাল বোধি দ্রুমের সুশীতল ছায়ায় এনে রাখলেন। মুহুর্তের মধ্যেই স্বর্গীয় অপ্সরীরা পালঙ্কের চারপাশে এসে ভীর জমান। তারা রানীকে পালঙ্ক থেকে নামিয়ে মানস সরোবরে অতি যত্নে সুরভিত জল দিয়ে স্নান করান। এরপর হরেক রকমের ফুল দিয়ে রাণীকে সাজিয়ে অন্য একটি সোনার পালংকে শুইয়ে দেয়া হয়। তখনি নিকটবর্তী পর্বতথেকে একটি শ্বেত হস্তী শুঁড়ে শ্বেত পদ্ম নিয়ে রানীর চারপার্শ্বে প্রদক্ষিণ করে।
পরদিন সকালে রাণী রাজাকে স্বপ্নের সব কথা খুলে বলেন। স্বপ্নের বৃত্ত্বান্ত শুনে রাজার মন আনন্দে ভরে উঠে। তিনি আর দেরী না করে রাজ্যের নামকরা জোতিষীদের ডেকে আনার জন্য তাঁর মন্ত্রীকে নির্দেশ দিলেন। জোতিষীরা রাজপ্রাসাদে আগমন করলে রাজা তখন রাণীর স্বপ্নের কথা তাদেরকে খুলে বলেন এবং এ বিষয়ে তাদের মতামত জানতে চান। জোতিষীরা রাজার সমস্ত কথা শুনে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করেন। পরে তারা একযোগে জানালেন যে মহারাজের ঘরে অতি সৌভাগ্যবান সুন্দর ফুটফুটে এক শিশু জন্ম নিবে। তারা আরো জানালেন, এই শিশু বড় হয়ে রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব নিলে শ্রেষ্ঠ রাজা হবে, আর গৃহ ত্যাগ করলে জীব জগতের উদ্ধারকর্তা হবে। জ্যোতিষীদের কথায় রাজপরিবারের অনেকেই খুশি হতে পারেননি। এই শিশু বড় হয়ে যাতে গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী না হয় সে জন্য ভগবানের কাছে তারা দিবারাত্র প্রার্থনা করতে থাকেন।
এভাবে কেটে গেল প্রায় ১০ মাস। রাণীর ইচ্ছে হল পৈত্রিক বাড়িতে বেড়াতে যাবার। যে পথে রাণী পৈত্রিক বাড়িতে যাবেন সে পথে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সুন্দরভাবে সাজানো হল। বৈশাখী পুর্ণিমার পুর্বরাত্র। দিনের আলোর মত পরিষ্কার চাঁদনীর আলো যেন সমস্ত ভু-প্রকৃতিকে রুপো দিয়ে মুড়িয়ে দিয়েছে। সমস্ত রাজপ্রসাদ রাণীর পৈতৃক বাড়িতে যাবার জন্য ব্যস্ত। রাণীমার যেন আর সময় কাটে না, পিত্রালয়ে যাওয়ার আনন্দে অস্থির হয়ে পড়েছেন।
পরদিন প্রত্যুষে বৈশাখী পুর্ণিমার শুভদিনে মহামায়া ও মহাপ্রজাপতি সহচরীদের নিয়ে সোনার রথে চেপে পৈত্রিক রাজ্য দেবদহের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথের দুধারে অপেক্ষামান প্রজারা হুল ও শঙ্খধ্বনি বাজাতে লাগলেন। যেতে যেতে অনেক দূরে শাক্য ও দেবদহ রাজ্যের মাঝামাঝি স্থানে অসংখ্য গাছপালায় পরিপুর্ণ এক উদ্যানের (বর্তমানে যা লুম্বিনী উদ্যান নামে পরিচিত) মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় ক্লান্ত রাণী- ও মহাপ্রজাপতি ক্ষণকালের জন্য জিরিয়ে বনের অপার সৌন্দর্য দেখার জন্য রথ থামানোর নির্দেশ দিলেন। রথ থেকে নেমে তারা বিশাল উদ্যানে সখীদের নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন। অবিশান্ত রাণী একটু জিরিয়ে নিতে শালগাছের একটী শাখা ধরলেন আর তখনই শুরু হলো রাণীর প্রসব বেদনা। অল্পক্ষনের মধ্যেই ভুমিষ্ট হল পুর্ণিমার চাঁদের মত ফুটফুটে এক পুত্র সন্তান। এ যেন আকাশের পুর্ণিমার চাঁদ মর্ত্যে নেমে এলো। সাথে সাথে হাতীর বৃংহতি, ময়ুরের কেকা ধ্বনি, অর্শের হ্রেষা রব ও পাখিদের কলকাকলীতে সমস্ত প্রকৃতিতে যেন আনন্দের বন্যা বয়ে যেতে লাগলো।