২৫৬১ বুদ্ধাব্দ ৬ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০১৭ইংরেজী

কচ্ছপ জাতক

রবিবার, ০৮ মে ২০১৬ ১৯:২৪ প্রতীক

পুরাকালে বারাণসী নগরে ব্রহ্মদত্ত নামে এক রাজা ছিলেন। তাঁহার সময়ে বোধিসত্ত্ব কাশী রাজ্যে কোনো এক ব্রাহ্মণকূলে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। বয়সপ্রাপ্ত হইলে তিনি তক্ষশীলায় গমন করিয়া বহুবিধ শাস্ত্র অধ্যয়ন করিলেন। অনন্তর বীতকাম হইয়া তিনি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করিয়া হিমবৎ প্রদেশে গঙ্গাতীরে এক আশ্রম নির্মাণ করিয়া তথা ধ্যানে লিপ্ত হইলেন। এই জন্মে বোধিসত্ত্ব সমুদয় জ্ঞানের মধ্যে স্থৈর্য বা উপেক্ষায় বিশেষভাবে পারদর্শী হইয়াছিলেন। ধ্যানকালে বোধিসত্ত্ব যখন পর্ণকুটীরের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করিতেন, তখন একটি দুঃশীল, প্রগল্ভ মর্কট তথায় সমাগত হইয়া তাঁহার কর্ণকুহরে নিজ মেহন প্রবিষ্ট করাইয়া রেতঃপাত করিত। স্থৈর্যে পরম শীলিত বোধিসত্ত্ব ইহা নিবারণের জন্য কোনরূপ প্রয়াস করিতেন না। একদা একটি কচ্ছপ জল হইতে রোদ পোহাইবার নিমিত্ত উত্থিত হইয়া গঙ্গাতটে মুখব্যাদান করিয়া নিদ্রাগত হইয়া পড়িয়াছিল। তাহাকে দেখিয়া ওই লালসাগ্রস্ত বানর তাহার মুখবিবরেও মেহন প্রবেশ করাইয়া দিল। কিন্তু রেতঃ নিক্ষিপ্ত হইলে নিদ্রাভঙ্গ হওয়াতে কচ্ছপ জাগিয়া উঠিয়া সেই মেহন দংশন করিয়া বসিল। প্রবল বেদনা জাগ্রত হইলে ওই মর্কট চিন্তিত হইল, এমন কে আছেন যিনি আমাকে এই দুঃখ হইতে পরিত্রাণ করিতে পারেন, যাঁহার কাছে গিয়া আমি শান্তিলাভ করিতে পারি? এমন বিচার করিয়া সে দুই হাত দিয়ে কচ্ছপটিকে উত্তোলন করিয়া সে অবস্থায় বোধিসত্ত্বের নিকট উপস্থিত হইল। বোধিসত্ত্ব এই দুষ্ট মর্কটকে এমন পরিস্থিতিতে দেখিয়া তাহাকে পরিহাসপূর্ব্বক প্রথম গাথাটি বলিলেন: অন্নভাণ্ড হস্তে লইয়া কোন ব্রাহ্মণ ফেরে? ভিক্ষা পাইলে কোনোখানে? নাকি ফিরিছ শ্রাদ্ধ সেরে? ইহা শুনিয়া সেই বানর বলিল, মূর্খ একটি মর্কট আমি, দয়া করি মোরে ক্ষমা কর স্বামী– স্পর্শ-যোগ্য নয় যাহা, তাহা ছুঁইয়া করেছি ভ্রান্তি– লভিলে মুক্তি, ফিরি পর্ব্বতে; কৃপা করি দাও শান্তি। অতঃপর বোধিসত্ত্ব কচ্ছপকে উদ্দেশ্য করিয়া তৃতীয় গাথাটি শোনাইলেন: কাশ্যপ-গোত্র এ কচ্ছপ, জানিও; মর্কট গোত্রে যে কৌণ্ডিন্য; কচ্ছপ, করহ মোচন উহাকে– হ’ল তব মৈথুন সম্পন্ন। বোধিসত্ত্বের বচন শুনিয়া প্রসন্ন চিত্তে কচ্ছপটি মর্কটের মেহন মুখ হইতে মুক্ত করিয়া দিল। মুক্তি পাইবামাত্র সে বানর বোধিসত্ত্বকে প্রণাম করিয়া সত্বর পলায়ন করিল; পুনর্বার ফিরিয়াও তাকাইল না। কচ্ছপও তাঁহাকে নমস্কার করিয়া যথাস্থানে গমন করিল। বোধিসত্ত্ব নির্বিঘ্নে ধ্যানে নিমজ্জিত হইয়া যথাসময় ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত করিলেন। [কথান্তে শাস্তা সত্যসমূহ ব্যাখ্যা করিলেন। সমবধান – এই মহামাত্রদ্বয় ছিলেন সেই কচ্ছপ ও বানর এবং আমি ছিলাম সেই তাপস।] টীকা: মহামাত্র – অমাত্য, পারিষদ বিবাদভঞ্জন – ঝগড়া মিটমাট শাস্তা – বুদ্ধদেব, বোধিসত্ত্ব জেতবন – রাজা জেত এই উদ্যানটি বুদ্ধদেবের সংঘ তৈরির জন্য দান করেন। বুদ্ধদেব সেই আশ্রমে প্রায়ই অবস্থান করতেন। দ্বিনিপাত – জাতকের যে সব গল্পে দুটো করে গাথা(কবিতা) থাকে সেগুলো দ্বিনিপাত বলে; এইটায় তিনটে গাথা আছে বলে এটা ত্রিনিপাত-এর মধ্যে পড়বে। আরো স্পষ্ট করে বললে, দ্বিনিপাত হচ্ছে দুটো গাথা-ওয়ালা সব জাতকের সংগ্রহ। তক্ষশীলা – প্রাচীন বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় বীতকাম – কামনা-বাসনা ত্যাগ করা প্রব্রজ্যা – সন্ন্যাস হিমবৎ প্রদেশ – হিমালয়ের কাছাকাছি কোনো অঞ্চল পর্ণকুটীর – পাতার কুঁড়েঘর প্রগল্ভ – ফাজিল মেহন – শিশ্ন রেতঃপাত – বীর্যপাত শীলিত – অনেক অনুশীলন/চর্চা করেছে যে মুখব্যাদান – মুখ হাঁ করা গাথা – কবিতা/শ্লোক অন্নভাণ্ড – ভাতের (খাবারের) পাত্র ব্রহ্মলোক – স্বর্গলোক, তপস্যার ফলে প্রাপ্ত পরম ধাম সমবধান – জাতক-কাহিনীর শেষের ব্যাখ্যা, যেখানে আগের কাহিনীর সঙ্গে বর্তমানের (যার সূত্রেই ওই কাহিনী বলা শুরু) সম্পর্ক বোঝানো হয়।